সারাদেশে নির্বাচনি প্রচারণা

২৪ঘণ্টা অনলাইন : নির্বাচনি প্রচারণায় পুরো দেশ। প্রতীক পেয়েই প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন প্রার্থীরা। আনুষ্ঠানিকভাবে বুধবার মধ্যরাত থেকে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের তপশিল, মনোনয়নপত্র দাখিল ও বাছাই, আপিল শুনানি ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে গতকাল বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রতীক পাওয়ার পর থেকেই অনলাইন ও অফলাইনে প্রচারণা শুরু করেছেন সারা দেশের প্রার্থীরা।
এদিকে নির্বাচনি প্রচারণাকে সামনে রেখে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মীরা যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে, তবে তার দায় প্রার্থীদের ওপরই বর্তাবে। এদিকে এবারের নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে ফেস্টুন ও ডিজিটাল ব্যানারে ঝুঁকছেন প্রার্থীরা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ছাপাখানাগুলোতে এ উপলক্ষ্যে চলছে বিশেষ ব্যস্ততা।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের মানতে হবে বেশ কিছু নির্দেশনা। না হয় আচারণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থিতাও বাতিল হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইনে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীকে সাতটি নির্দেশনা মানতে হবে। এগুলো হলো—একজন প্রার্থী, তার নির্বাচনি এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ফেসবুক বা অন্যান্য যেসব প্ল্যাটফরমে প্রচার চালাবেন, সেগুলোর নাম, আইডি, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য আগেই রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। নির্বাচনি প্রচারে কোনোভাবেই অসত্ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, কারো ছবি বিকৃতি করা বা ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো রকম ঘৃণামূলক, উসকানিমূলক কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতিকে ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাবে না। নির্বাচনি স্বার্থে ধর্ম বা জাতির অপব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো পোস্ট বা তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। গুজব, বিভ্রান্তিকর পোস্ট কিংবা যাচাই না করে তথ্য প্রচার করা যাবে না। প্রচারণার ক্ষেত্রে কোনো দল, প্রার্থী বা তাদের সমর্থকেরা কারো সুনাম নষ্ট বা চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি, সম্পাদনা, প্রচার বা শেয়ার করতে পারবেন না। এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, বুধবার (২১ জানুয়ারি) মধ্যরাত থেকে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোট সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় তিনি এ কথা জানান।
অফলাইন বা সরাসরি প্রচারণার ক্ষেত্রে কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা করতে পারবেন না। পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোয়াডকপ্টার (ড্রোন) বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবেন। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবেন না। যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, শুধু সেগুলোতে আলো বা বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তবে আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ নয়, প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা ও আচরণবিধি মানতে প্রার্থী ও দলের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা কোনো প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে নির্বাচনি অনিয়ম অনুসন্ধান ও অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য ‘নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি’ গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খাবাহিনী মাঠে নামানো হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু অনেকে প্রতীক পাওয়ার পরই প্রচারণা শুরু করে। সেটি আমরা না চাইলেও করে। তবে প্রতীক বরাদ্দের পর কেউ যদি আচারণবিধি না মানে সেক্ষেত্রে ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের শাস্তি দেবে। আমাদের আইনগত সব ব্যবস্থা নেওয়া আছে। তিনি বলেন, আশা করি সব দলই সংযত আচরণ বজায় রাখবেন। যে যার মত প্রকাশ করবেন। পরস্পরের মধ্যে যেন কোনো সংঘর্ষ না হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক বাছাই পর্ব। এতে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। ফলে ৩০০ আসনে বৈধ প্রাথী ছিল ১৮৪২ জন। এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেন ৬৪৫টি জন প্রার্থী। ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৯ দিনের আপিল শুনানির পর ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব, ১ শতাংশ ভোটের সমর্থনে গরমিল, হলফনামায় অসঙ্গতি ও মনোনয়নপত্র দাখিলে ত্রুটির কারণে আপিল কমিশন ২০০ জন প্রার্থীকে অবৈধ ঘোষণা করে।
রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে (বাতিল-গ্রহণ) প্রার্থিতা ফিরে পান ৪১৮ জন প্রার্থী। এছাড়া আপিল আবেদন প্রত্যাহার ও অনুপস্থিতির কারণে বাকি ২৭ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। আপিল শুনানি শেষে মোট বৈধ প্রার্থী দাঁড়ায় ২২৫৩ জনে। এরপর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে ৩০৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলে সর্বমোট বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাড়ায় ১৯৬৭ জন।
নির্বাচনি আচরণবিধির সংশোধনী প্রকাশ: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, এর ধারা ৯১(খ) তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, নির্বাচন কমিশন ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ এর কিছু বিষয় সংশোধন করেছে। বিদ্যমান বিধিমালার বিধি ৪-এর উপ-বিধি (৩) তে উল্লেখ আছে যে ‘কোনো প্রার্থী নির্বাচন পূর্ব সময়ে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলভুক্ত কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কিংবা ফলক উন্মোচন করা যাইবে না।’ নতুন সংশোধনীতে এখানে ‘করা যাইবে না’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘করিতে পারিবেন না’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে, বিধি ৬-এর (আ) দফা (খ) এর পরিবর্তে ‘নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পূর্বে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কর্তৃক যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট নির্বাচনি প্রচারণা কর্মসূচির প্রস্তাব প্রদান করিতে হইবে এবং একই স্থানে ও একই সময়ে একাধিক দল বা প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণা কর্মসূচির ক্ষেত্রে, প্রয়োজনে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উহার সমন্বয় করিবে’—দফাটি প্রতিস্থাপিত হবে। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী জনসভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সভার কমপক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা আগে জনসভার স্থান এবং সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে এবং পুলিশ কর্তৃপক্ষ উক্ত স্থানে চলাচল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সেইসঙ্গে এ সংশোধনী অনুযায়ী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড এর ওপর অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড টাঙানো যাবে না এবং উক্ত ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড এর কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন তথা বিকৃতি বা বিনষ্ট করা যাবে না। এতে আরো বলা হয়েছে, সংসদীয় আসনের প্রত্যেক ইউনিয়ন বা পৌরসভা বা মেট্রোপলিটন এলাকার ক্ষেত্রে ওয়ার্ড প্রতি একটি অথবা সমগ্র নির্বাচনি এলাকায় ২০টির অতিরিক্ত বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কোনো নির্বাচনি এলাকার একক কোনো জনসভায় একই সঙ্গে তিনটির অধিক মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সাধারণ প্রচারণার জন্য ব্যবহূত মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।
