জেগে ওঠুক বিশ্ব মানবতা
মাইলস্টোন স্কুল ট্রাজেডি

♦ ড. রাজিয়া সুলতানা
ঢাকার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধবিমানটি অনুশীলন চলাকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বিস্ফোরিত হয়। ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং বিমান চালকসহ অনেকে। এই মর্মান্তিক বেদনা বিধূর ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং এটি প্রশ্নে তীর ছুড়ে দিচ্ছে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা এবং জননিরাপত্তা দিকে।
গত ২১ জুলাই ২০২৫ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দুপুর ১.১৫-১.২০ মিনিটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজ ক্যাম্পসে বিধ্বস্ত হয়। ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১ জন (২৫ জন শিক্ষার্থী, ২ শিক্ষক, ১ পাইলট, ৩ জন কর্মচারী) নিহত এবং প্রায় ১৬৫ জনেরও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এদের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণীর কোমলমতি শিশুরাই বেশী। কারণ বিমানটি প্রারম্ভিক ভবনের উপর ছুটির ঠিক র্পূবমুহূর্তে বিধ্বস্ত হয়। এতে ভবনের একাংশ সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়। এই ঘটনাটি শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। যেমন- People.com: At least 19 dead শিরোনামে মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেছে।The Times (UK): প্রশ্ন তুলেছে চিনা‑তৈরি যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তা নিয়ে।The Daily Beast (USA): এটিকে "training negligence" হিসেবে চিহ্নিত করেছে।Times of India: সোভিয়েত আমলের প্রযুক্তি দিয়ে এখনো প্রশিক্ষণের সমালোচনা করেছে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মিডিয়া স্পষ্টভাবে নিরাপত্তাহীনতা, প্রযুক্তির দুর্বলতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অনুশীলনের দায়ভার বাংলাদেশ সরকারের কাধে তুলে দিয়েছে।
একদিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা; অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি চার্জ, লাশের সংখ্যা নিয়ে নানা অনভিপ্রেত ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে স্থানীয় জনগণ। বিধ্বস্তের পর উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল উত্তরাসহ রাজধানী ঢাকা বিভিন্ন স্থান। শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিবাদ। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদিতে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। উঠে এসেছে বিভিন্ন দাবি- জনবহুল অঞ্চলে বিমান অনুশীলন নিষিদ্ধকরণ, নিহতদের পরিবারকে স্থায়ী ক্ষতিপূরণ এবং দায়ী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
সরকার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারার মতো দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এফ-৭ হলো সোভিয়েত আমলের মিগ-২১’এর একটি চিনা সংস্করণ। বিমান বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে হয়েছেও। কিন্তু অনেক কিছু রয়ে গেছে আগের মতোই। পুরনো বিমানের ধ্বংসযজ্ঞ তা স্পষ্টভাবে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল।
আমাদের সমাজে সভ্যতার মানদণ্ড যে কি; আসলে তা বুঝে উঠা খুবই দূরহ ব্যাপার। শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা একজন শিক্ষার্থী যুদ্ধের অনুশীলনের বলি হলো— এটা অভাবিত ঘটনা। ঠিক আমাদের মনে করিয়ে দেয় গাজার ধ্বংসস্তূপে, আফগানিস্তানের শিবিরে শিশুদের সারি সারি লাশের কথা। আমাদের দেশের সাথে ভিন্নতা ওদের দেশের লাশ সামনে রেখেও খাবারের জন্য হাহাকার করে, এই যা। কিন্তু শিশুদের আর্তনাদ, হাহাকার কান্নার ভাষা সব দেশেই এক। জাতি বা দেশভেদে এই আহাজারি আলাদা হয় না। এই অমানবিকতা বিশ্ব সভ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। আর তখনই বিশ্বে মানবতার কল্যাণে প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি কিংবা উন্নয়ন— সবকিছু অর্থহীন হয়ে যায়।
সভ্যতা এবং উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও আমরা শিশু তথা মানব জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছিনা। আর শুধু চোখ মুছেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিতে হবে যেখানে মাইলস্টোনের মতো ট্রাজেডি আর কোনোদিন কোনো প্রতিষ্ঠানে ঘটবে না। শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর জন্য নীতি নির্ধারণ, অস্ত্রের আধুনিকায়ন নয়; নিশ্চিত করতে হবে মানবিক বিশ্বভ্রামাণ্ড। মাইলস্টোন ট্রাজেডি হোক বৈশ্বিক বিবেক জাগরণের নতুন নাম।
লেখক : শিক্ষক এবং সমাজকর্মী
