দূষণের চাপে সুন্দরবনের পানি,কাঁকড়ায় প্লাস্টিক, মাছে তামা-সিসা
ম. ম. রবি ডাকুয়া

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নদী-খালের পানিতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। পানির পাশাপাশি নদীর তলদেশের পলি এবং জলজ প্রাণীর দেহেও দূষক পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং মাছের দেহে তামা, সিসাসহ বিভিন্ন ধাতুর সঞ্চয়ের সম্ভাবনা সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য, খাদ্যশৃঙ্খল ও উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের সুন্দরবনসংলগ্ন জলপৃষ্ঠ ও তলদেশের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়। গবেষণায় বর্ষার আগের মৌসুমে পানিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ৮১ হাজার ৫৬টি এবং পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৪৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এ পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭৩ হাজার ৭২২টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ৪১টি। গবেষকেরা ভাটির দিকে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি উজানের তুলনায় বেশি পেয়েছেন। এসব ফলাফল সুন্দরবনের জলজ পরিবেশে প্লাস্টিকদূষণের বিস্তার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
অন্যদিকে, সুন্দরবনের নদী ও পলিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় তামা, সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও পারদের মতো উপাদান পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব উপাদানের উৎস হিসেবে শিল্পকারখানার কার্যক্রম, কৃষিজ প্রবাহ, বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড, নৌযান চলাচল এবং প্রাকৃতিক ভূ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ভূমিকা উঠে এসেছে। তবে সব নদী, সব মৌসুম ও সব জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে দূষণের মাত্রা এক নয়। তাই সুন্দরবনের সামগ্রিক পরিবেশকে একই মাত্রায় দূষিত বলে চিহ্নিত না করে এলাকাভিত্তিক ও মৌসুমভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিস্থিতি নির্ধারণ করা জরুরি।
পানিতে প্লাস্টিকের অদৃশ্য বিস্তার
প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, খাবারের মোড়ক, মাছ ধরার জাল, দড়ি ও অন্যান্য বর্জ্য নদী-খালে জমে সময়ের সঙ্গে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে সাধারণভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এসব কণা খালি চোখে সব সময় দেখা যায় না। ফলে নদীর পানির ওপরিভাগ পরিষ্কার দেখালেও তাতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের উপস্থিতি থাকতে পারে।
সুন্দরবনের নদী ও খাল জোয়ার-ভাটার সঙ্গে নিয়মিত পানির প্রবাহ ও পলি পরিবহনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়। এ ব্যবস্থায় প্লাস্টিকের কিছু অংশ ভেসে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে, আবার কিছু অংশ নদীর তলদেশের পলিতে আটকে থাকতে পারে। পানির প্রবাহ, মৌসুমি বৃষ্টি, জোয়ার-ভাটা এবং নদীর অবস্থান অনুযায়ী এসব কণার বিস্তার ও ঘনত্বে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
সুন্দরবনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে ২০২৩ সালের গবেষণায় পলির পাশাপাশি জলপৃষ্ঠেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় পলিতে প্রধানত ৩০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণার উপস্থিতি এবং পলিতে পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট বা পিইটির উল্লেখযোগ্য অংশ পাওয়ার কথা বলা হয়। পিইটি সাধারণত বিভিন্ন বোতল ও প্যাকেজিং উপকরণে ব্যবহৃত হয়।
এ ধরনের ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, প্লাস্টিক বর্জ্য শুধু নদীর দৃশ্যমান সৌন্দর্য নষ্ট করছে না; এর ক্ষুদ্র অংশ পরিবেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব কণা কোথা থেকে এসেছে, কোন পথে ছড়িয়েছে এবং কোন এলাকায় কতটা জমেছে, তা নির্ধারণে আরও বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
কাঁকড়া ও জলজ প্রাণীর জন্য কী ঝুঁকি
সুন্দরবনের নদী-খাল কাঁকড়া, চিংড়ি, মাছ, শামুকসহ বহু জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। এসব প্রাণীর অনেকেই খাদ্য সংগ্রহের সময় পানির সঙ্গে তলদেশের পলি গ্রহণ করে। ফলে পরিবেশে থাকা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা তাদের দেহে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোনো কাঁকড়ার দেহে প্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে তার নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং কণার প্রকৃতি শনাক্ত করা প্রয়োজন।
ভারতের সুন্দরবন জীবমণ্ডল সংরক্ষিত এলাকার কাঁকড়া নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সামুদ্রিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান এবং কাঁকড়ার নির্বাচিত দেহাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা করা হয়। সেখানে কাঁকড়ার দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার বিষয়টি উঠে আসে। তবে ভারতীয় অংশের ওই গবেষণার ফল সরাসরি বাংলাদেশের সুন্দরবনের সব কাঁকড়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না। বাংলাদেশের নদী-খালে ধরা কাঁকড়ার দূষণের মাত্রা জানতে স্থানীয় নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক জলজ প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করলে খাদ্য গ্রহণ, পরিপাক ও শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। কণার আকার, রাসায়নিক গঠন, পরিমাণ এবং প্রাণীর প্রজাতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করতে পারে। প্লাস্টিকের সঙ্গে যুক্ত কিছু রাসায়নিক পদার্থ কিংবা কণার গায়ে শোষিত দূষকও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তবে পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া মানেই প্রতিটি কাঁকড়া মানুষের জন্য ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়নে কাঁকড়ার কোন অংশে কণা রয়েছে, কত পরিমাণে রয়েছে, তা রান্না ও খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে কতটা শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কতটা—এসব বিষয় পরীক্ষা করা জরুরি।
কাঁকড়া সুন্দরবনের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বনের ওপর নির্ভরশীল জেলে ও উপকূলীয় ব্যবসায়ীরা কাঁকড়া আহরণ ও বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। পণ্যের মান নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়লে বাজারে চাহিদা ও দামেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
মাছে তামা-সিসাসহ ভারী ধাতুর উপস্থিতি
প্লাস্টিকদূষণের পাশাপাশি সুন্দরবনের নদী ও পলিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। তামা, সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, পারদ, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো উপাদান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় পরিবেশে থাকতে পারে। আবার শিল্পকারখানার বর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিকের প্রবাহ, নৌযানের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও এসব উপাদান পরিবেশে যুক্ত হতে পারে।
তামা জীবদেহের জন্য অল্প পরিমাণে প্রয়োজনীয় একটি মৌল হলেও অতিরিক্ত মাত্রায় তা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে, সিসার কোনো পরিচিত জৈবিক প্রয়োজন নেই এবং এর সংস্পর্শ মানবস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। দীর্ঘমেয়াদি বা অতিরিক্ত সিসার সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সিসার সংস্পর্শ বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়।
২০১৯ সালে প্রকাশিত সুন্দরবনের বিভিন্ন পরিবেশগত উপাদানে ট্রেস মেটাল বা অতি অল্প ঘনত্বে থাকা ধাতু নিয়ে একটি পর্যালোচনা গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পানির তুলনায় মাটি ও তলদেশের পলিতে ধাতুর দূষণ বেশি হতে পারে। গবেষণাটিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশ নিয়ে গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। ফলে দূষণের বিস্তার ও মানবস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণে আরও স্থানীয় গবেষণা প্রয়োজন।
২০২১ সালে প্রকাশিত সুন্দরবনের শেলা নদী ও আশপাশের জলজ পরিবেশে ভারী ধাতু নিয়ে একটি গবেষণায় পানির নমুনায় কিছু ধাতুর মাত্রা প্রযোজ্য গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে বেশি পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে নদীর পানির মান মূল্যায়নে ক্যাডমিয়াম, সিসা, কোবাল্ট ও নিকেলসহ কয়েকটি উপাদান নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ওই গবেষণার ফল নির্দিষ্ট স্থান ও নমুনা সংগ্রহের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত; তা দিয়ে বর্তমানে সুন্দরবনের সব নদীর পানির অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না।
মাছের দেহে ধাতু জমার বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পানিতে কোনো ধাতুর উপস্থিতি থাকলেই সব মাছের দেহে একই পরিমাণে তা জমবে না। মাছের প্রজাতি, বয়স, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান এবং দূষকের রাসায়নিক রূপের ওপর এর মাত্রা নির্ভর করে। একইভাবে মাছের দেহে কোনো ধাতু শনাক্ত হওয়া এবং সেই মাছ খেলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়া—দুটি আলাদা বিষয়। খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি নির্ধারণে পরীক্ষার ফলের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য মাত্রা ও খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ তুলনা করতে হয়।
২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বাগেরহাটের পশুর নদীর ১০ প্রজাতির বাণিজ্যিক মাছের দেহে ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় মাছের দেহে সিসার গড় ঘনত্ব পাওয়া যায় প্রতি কেজিতে ২.৩২ ± ০.৭৩ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে, সুন্দরবনের জলজ পরিবেশ নিয়ে পৃথক একটি গবেষণার সারণিতে কয়েকটি মাছ ও চিংড়িজাতীয় প্রাণীর পেশিতে তামার ঘনত্ব প্রতি কেজিতে ৪.২৩ থেকে ৮.৩০ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে। তবে গবেষণার স্থান, নমুনা ও পরীক্ষাপদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় এই দুটি ফল সরাসরি তুলনা করা যায় না।
গবেষকেরা পশুর নদীর মাছের ক্ষেত্রে ভারী ধাতুর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে নদীসংলগ্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও মানবসৃষ্ট কার্যক্রমের ভূমিকা চিহ্নিত করেছেন। তবে মাছের দেহে ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া এবং তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া এক বিষয় নয়। ঝুঁকি নির্ধারণে মাছের প্রজাতি, নমুনায় ধাতুর ঘনত্ব, খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ এবং প্রযোজ্য খাদ্যনিরাপত্তা মান বিবেচনা করতে হয়।
নদীর পানি থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে দূষক
সুন্দরবনের নদী, খাল, পলি, শৈবাল, ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী, মাছ ও কাঁকড়া পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি খাদ্যজাল গঠন করে। পানিতে থাকা দূষক পলিতে জমতে পারে। পলি থেকে কিছু দূষক জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করতে পারে। পরে সেই প্রাণী অন্য প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হলে দূষক খাদ্যজালের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যেতে পারে।
এ প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে খাদ্যশৃঙ্খলে দূষকের স্থানান্তর বলা হয়। কিছু রাসায়নিক উপাদান নির্দিষ্ট জীবের দেহে জমতে পারে। তবে সব ধাতু বা দূষক একইভাবে জমে না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরে ঘনত্ব বাড়ে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ঘটে না।
সুন্দরবনের মতো জোয়ার-ভাটানির্ভর ম্যানগ্রোভ পরিবেশে পলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পলি একদিকে পুষ্টি উপাদান বহন করে, অন্যদিকে কিছু দূষক আটকে রাখতেও পারে। পানির লবণাক্ততা, অম্লত্ব, অক্সিজেনের মাত্রা ও পলির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বদলালে এসব দূষকের চলাচলও পরিবর্তিত হতে পারে।
এ কারণে শুধু পানির নমুনা পরীক্ষা করে সুন্দরবনের দূষণের পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে পানি, পলি, মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য নির্বাচিত জলজ প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করে তাদের মধ্যে দূষকের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
দূষণের উৎস কোথায়
সুন্দরবনের জলজ পরিবেশে দূষকের উৎস একাধিক হতে পারে। নদী দিয়ে ভেসে আসা প্লাস্টিক, পর্যটন ও নৌযান থেকে ফেলা বর্জ্য, মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত পরিত্যক্ত জাল ও দড়ি, বসতবাড়ির বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লাস্টিকদূষণ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, শিল্পাঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড, কৃষিজ জমি থেকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে আসা রাসায়নিক এবং নৌযান-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন দূষকের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট দূষণ ঘটনার জন্য একটি উৎসকে দায়ী করতে হলে নদীর প্রবাহ, বর্জ্য নির্গমনের তথ্য এবং পরীক্ষাগারের ফলের ভিত্তিতে প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।
সুন্দরবনের ভেতর ও আশপাশের নদীগুলো উজান থেকে আসা পানি ও পলি বহন করে। ফলে বনের অভ্যন্তরে দূষণ দেখা গেলেই তার উৎস বনের ভেতরে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, কোনো শিল্পাঞ্চল বা বন্দরের কাছাকাছি দূষক পাওয়া গেলেই নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না, যদি না নমুনা ও নির্গমনসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া যায়।
দূষণের উৎস শনাক্ত করতে উজান, ভাটি, বন্দরসংলগ্ন এলাকা, শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি নদী এবং অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবিত স্থান থেকে একই সময়ে নমুনা সংগ্রহ করা যেতে পারে। বর্ষার আগে, বর্ষার পরে এবং শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত পরীক্ষা করলে দূষণের মৌসুমি পরিবর্তন ও সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে সম্ভাব্য প্রভাব
সুন্দরবন শুধু সুন্দরী, গেওয়া, গরান ও কেওড়ার মতো উদ্ভিদের বন নয়; এটি মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, শামুক, পাখি, সরীসৃপ ও অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবের আবাসস্থল। নদী ও খালের পানি, পলি এবং ম্যানগ্রোভের শিকড় মিলিয়ে এখানে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে।
পানিতে দূষকের মাত্রা বেড়ে গেলে কিছু জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি, প্রজনন, খাদ্য গ্রহণ ও বেঁচে থাকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে দূষকের ধরন, ঘনত্ব, সংস্পর্শের সময় এবং প্রাণীর সংবেদনশীলতার ওপর। একইভাবে, প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব বুঝতে বিভিন্ন প্রজাতি ও আবাসস্থল নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা প্রয়োজন।
ম্যানগ্রোভের শিকড়ের আশপাশে পলি জমা, জৈব পদার্থের পচন এবং ক্ষুদ্র প্রাণীর বিচরণ জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। দূষক এসব প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা জানতে শুধু দৃশ্যমান বর্জ্য অপসারণ যথেষ্ট নয়। পানির রাসায়নিক মান, দ্রবীভূত অক্সিজেন, পলির গুণাগুণ এবং জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্যও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দূষণের প্রভাব নির্ধারণের পাশাপাশি বন উজাড়, নদী-খালের নাব্যতা, লবণাক্ততার পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য চাপের সঙ্গে দূষণের সম্পর্কও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি বাস্তুতন্ত্রের অবস্থা সাধারণত কোনো একক কারণে নির্ধারিত হয় না।
জেলে ও উপকূলের মানুষের জীবিকায় প্রভাব
সুন্দরবনের নদী-খাল বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। জেলে, কাঁকড়া আহরণকারী, নৌযানশ্রমিক, মাছ ব্যবসায়ী এবং উপকূলীয় বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এ সম্পদের ওপর নির্ভর করেন। বনের প্রাকৃতিক সম্পদ কমে গেলে কিংবা মাছ ও কাঁকড়ার মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে তাঁদের আয় ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে মাছ ও কাঁকড়ার বাজারে খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্যে দূষণের সন্দেহ তৈরি হলে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া পুরো এলাকার মাছ বা কাঁকড়াকে অনিরাপদ ঘোষণা করলে জেলেদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। আবার পরীক্ষায় দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা গোপন করাও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের জীবিকা—দুই বিষয়কে পাশাপাশি রেখে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত খাদ্যমান পরীক্ষা, জেলেদের সচেতনতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রয়োজন সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ও কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
সুন্দরবনের দূষণ মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন একটি নিয়মিত ও সমন্বিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি। বন বিভাগের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নদী ও খালের নির্দিষ্ট স্থান থেকে পানি ও পলির নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি মাছ ও কাঁকড়ার নির্বাচিত প্রজাতি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
পরীক্ষার ফল শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে সহজবোধ্যভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। কোন এলাকায় কী ধরনের দূষক পাওয়া যাচ্ছে, মাত্রা কত, তা প্রযোজ্য মানের সঙ্গে কীভাবে তুলনীয় এবং কোন উৎসের ভূমিকার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
প্লাস্টিকদূষণ কমাতে নদী ও খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পর্যটনকেন্দ্র ও নৌযানে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল উদ্ধার এবং বর্জ্য পরিবহনের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; বর্জ্য কোথায় উৎপন্ন হচ্ছে এবং কীভাবে তা নদীতে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ভারী ধাতুর দূষণ মোকাবিলায় শিল্প ও বন্দরকেন্দ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষিত পানি শোধন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত নির্গমন পরীক্ষা জরুরি। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দূষণের উৎস শনাক্ত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গবেষণার ঘাটতি পূরণই বড় চ্যালেঞ্জ
সুন্দরবন নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাগুলো দূষণের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও সব এলাকায় একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী, খাল ও জলজ প্রাণীর মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, তুলনাযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একই পদ্ধতিতে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা না করলে বছরভিত্তিক পরিবর্তন বোঝা কঠিন। কোথাও দূষণ বেড়েছে কি না, কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না কিংবা কোন মৌসুমে ঝুঁকি বেশি—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে গবেষণার পাশাপাশি স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানো যেতে পারে। তাঁরা নদীর পানি, মাছের প্রাপ্যতা, কাঁকড়া আহরণ এবং বর্জ্যের পরিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিতে পারেন। তবে স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে পরীক্ষাগারের তথ্যের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং গবেষণার সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
বন বাঁচাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনই গুরুত্ব
সুন্দরবনের নদী-খালে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা এবং বিভিন্ন পরিবেশগত উপাদানে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার ফল দেখায়, এ বনকে সুরক্ষিত রাখতে শুধু গাছ ও বন্যপ্রাণী রক্ষা যথেষ্ট নয়; পানির মান এবং নদী-খালের স্বাভাবিক পরিবেশও সংরক্ষণ করতে হবে।
কাঁকড়া ও মাছের দেহে দূষক কতটা জমছে, তা মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন কোন এলাকায় দূষণের চাপ বেশি—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা ও স্বচ্ছ প্রতিবেদন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে প্রবেশ বন্ধ, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই বনের নদী-খাল দূষণের চাপে পড়লে তার প্রভাব শুধু জলজ প্রাণীর আবাসস্থলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দীর্ঘ মেয়াদে তা মানুষের জীবিকা ও পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। তাই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই সুন্দরবনের পানিকে দূষণমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা জোরদার করা প্রয়োজন।
