দশ কোটি টাকা ব্যয়ে সাফল্য মাত্র এক ব্রোঞ্জ!
এশিয়ান গেমসের গল্প সমাচার

মেজর চাকলাদার (অব.) ⇒
সম্প্রতি শেষ হওয়া এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অর্জনের খাতা পর্যালোচনা করলে হতাশা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। দেশের বহুল প্রচলিত ও পরিচিত কোনো খেলা থেকে আমরা কোনো সাফল্য পাইনি। একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে এসেছে নারীদের ৫২ কেজি ওজন শ্রেণীতে উশু থেকে আসা একটি ব্রোঞ্জ পদক, যা অর্জন করেছেন জিন্নাত আক্তার। তাঁর এই অর্জনে অবশ্যই অভিনন্দন ও বাহবা পাওয়ার দাবিদার।
তবে এই একটিমাত্র পদকের পেছনের সামগ্রিক চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৯০ জন পুরুষ অ্যাথলেট, ৯৮ জন নারী অ্যাথলেট এবং ৭২ জন অফিশিয়ালসহ মোট ২৬০ জনের বিশাল বহর পাঠানো হয়েছিল। গেমসে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন করেছিলেন শুটার আবদুল্লাহ হেল বাকী, যিনি তাঁর ইভেন্টে ২৬তম স্থান অধিকার করেছেন। অন্যদিকে, অপর পতাকা বহনকারী হুমায়রা আক্তার অন্তরা কারাতে ইভেন্টের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেন।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে বক্সার মোশাররফ হোসেন ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। তার প্রায় চার দশক (৪০ বছর) পর আজ আমরা আবার একটি ব্রোঞ্জ পদক পেলাম। এই গেমসে অংশগ্রহণ ও দলগত প্রস্তুতির জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় প্রায় দশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। দেশের জনগণের কষ্টের টাকা যেন আজ কাগজের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়!
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এত বড় ব্যর্থতার পরও দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা দায় স্বীকারের মানসিকতা নেই। ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে চতুর্থ স্থানে সন্তুষ্ট থাকার পর অধিনায়ক ও উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান লিটন দাস দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বা পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। আমাদের মধ্যে কোনো শক্ত মেরুদণ্ড কিংবা দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার মতো দৃঢ়তার অভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
খেলোয়াড়দের এই দৈন্যদশা ও ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা একদিনে তৈরি হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, একবার গাজীপুরের টঙ্গী এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছি; সেনাবাহিনীর মিডল ডিস্ট্যান্স রানাররা আর্মি স্টেডিয়াম থেকে দৌড়ে টঙ্গী ব্রিজ অতিক্রম করে আবার ফেরত যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে, তারা টঙ্গী ব্রিজের পাশের কাঁচাবাজারে নেমে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বাজার সদাই করছিল। এমনকি তাদের সাথে সাইকেলে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সুবেদার সাহেবও নেমে বাজার করছিলেন। অনুশীলনেই যদি এমন ফাঁকি ও অনিয়ম চলে, তবে প্রতিযোগিতার ফল তো হতদরিদ্র হবেই! যখন গোড়াতেই গলদ, তখন চূড়ান্ত প্রদর্শনীতে ভালো কিছুর আশা করা বৃথা।
আমাদের অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্বয়ং সেনাপ্রধান। দলগত এমন লজ্জাজনক ও ব্যর্থ ফলাফলের দাগ তো তাঁর গায়েও লাগে। এই ব্যর্থতার পর বাংলাদেশ দলের ‘চিফ দ্য মিশন’-এর উচিত দেশ ও জাতির কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা চাওয়া।
বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটারের সামনে বসলেই প্রতিটি দেশের খেলোয়াড়দের টাইমিং, স্কোর ও পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান সহজেই পাওয়া যায়। আমাদের খেলোয়াড়দের মান যেখানে বিশ্বমানের তুলনায় অনেক নিচে, সেখানে শত শত কর্মকর্তা ও অ্যাথলেটসহ ২৬০ জনের বিশাল বহর পাঠিয়ে দশ কোটি টাকা অপচয় করার যুক্তি কী? সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণের একধরনের ব্যাধি ও ঝোঁক সবসময়ই কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল, যা এখন খেলোয়াড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়; খেলার নামে অর্থ অপচয় আর এমন লজ্জাজনক পারফরম্যান্স আর কতকাল মেনে নেবে দেশের মানুষ?
