রূপপুরের বিদ্যুৎ আসবে নভেম্বরে

২৪ঘণ্টা অনলাইন :
রূপপুরের বিদ্যুৎ আসবে নভেম্বরে
২৪ঘণ্টা অনলাইন : মাসের পর মাস বিলম্বের পর অবশেষে আগামী নভেম্বর মাসে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এর মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদনে যাওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ও পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। বর্তমানে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি) সংক্রান্ত ত্রুটি সমাধানের কাজ চলছে।
পিওআরভি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে ফিশন রিঅ্যাকশন বা পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু করে পাওয়ার স্টার্টআপের দিকে এগোনোর কথা রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বি-টু ধাপ সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ এবং টারবাইনে ৩০ শতাংশ স্টিম তৈরি করতে আরও প্রায় ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে মোট প্রায় নয় সপ্তাহ বা দুই মাসের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে।
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট জানান, আদর্শ সময়সূচি অনুসরণ করা গেলে নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষা বা কারিগরি জটিলতা দেখা দিলে সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
যেভাবে উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ: রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর ফিজিক্যাল স্টার্টআপ সম্পন্ন করে রিঅ্যাক্টরে ফিশন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে। এতে তাপশক্তি উৎপন্ন হবে। সেই তাপের মাধ্যমে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে এবং বাষ্পের চাপ দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হবে। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
পিওআরভি পরীক্ষায় বিলম্ব: বর্তমানে কেন্দ্রটি চালুর আগে গুরুত্বপূর্ণ পিওআরভি পরীক্ষার কাজেই বিলম্ব হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় মাস ধরে এ পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। পরীক্ষা সফল হওয়ার পরই ফিশন রিঅ্যাকশন ও পাওয়ার স্টার্টআপের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হবে।
তবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতেও কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী উৎপাদনে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে থাকার আশা: ২০১৬ সালে রূপপুর প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ টাকা ৬৫ পয়সা। তবে প্রকৃত বিদ্যুৎমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় ও বীমাসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের বিষয়ে সমঝোতা হলে বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেনের মতে, সব খরচ যুক্ত হওয়ার পরও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে থাকতে পারে।
স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি: রূপপুরের ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা নিয়েও এখনো চূড়ান্ত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে এ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সমঝোতা থাকলেও রাশিয়াকে এ জন্য কত অর্থ দিতে হবে, সে বিষয়ে বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যবহৃত জ্বালানি রিঅ্যাক্টরে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ তুলনামূলক কম।
তবে বিশেষজ্ঞরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার পর নিয়মিত বিপুল পরিমাণ ভারি বর্জ্য তৈরি হবে। এসব বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য এখনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে, নির্ধারিত পরীক্ষা ও কারিগরি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে নভেম্বরেই রূপপুরের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে যুক্ত হবে পারমাণবিক শক্তির নতুন অধ্যায়।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
