জীবিকার তাগিদে শ্রমবাজারে নারীরা

২৪ঘন্টা অনলাইন: ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে রাজধানী। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ঝাড়ু, চায়ের দোকানের কেটলির ধোঁয়া আর কর্মস্থলের উদ্দেশে মানুষের ছুটে চলায় শুরু হয় নগর জীবনের ব্যস্ততা। তবে এই ব্যস্ততার আড়ালে প্রতিদিন নতুন এক সংগ্রামের দিন শুরু হয় একদল সুবিধাবঞ্চিত নারীর। কাজের আশায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন তারা, শুধু একদিনের শ্রম বিক্রি করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য।
রাজধানীর মধ্য বাড্ডার একটি মার্কেটের সিঁড়িতে প্রতিদিনের মতো জড়ো হন মধ্যবয়সী ও বয়স্ক নারীরা। কেউ গৃহস্থালি কাজের জন্য, কেউ নির্মাণশ্রমিক বা দিনমজুরের কাজের আশায় বসে থাকেন। কোনো ঠিকাদার বা মহাজন এলেই কাজ পাওয়ার আশায় তাকে ঘিরে ধরেন তারা। কিন্তু সবার ভাগ্যে কাজ জোটে না। কেউ কাজ পেয়ে স্বস্তি নিয়ে চলে যান, আবার অনেকে খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হন।
অভাবের তাড়নায় মজুরি নিয়েও দরকষাকষির সুযোগ থাকে না তাদের। ৭০০ টাকার কাজ অনেক সময় ৫০০ টাকাতেই করতে রাজি হয়ে যান শ্রমজীবী এসব নারী।
এই অপেক্ষমাণ নারীদের মধ্যে রয়েছেন চার সন্তানের জননী নাসিমা। স্বামী অনিয়মিতভাবে ড্রেন পরিষ্কারের কাজ করলেও সংসারের বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে তার কাঁধেই। মাসে ৪ হাজার টাকা বাসাভাড়া, সন্তানের খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হতে হয় তাকে।
কষ্ট আর ক্ষোভের কথা জানিয়ে নাসিমা বলেন, “মাইয়া হইয়া জন্মাইছি, সংসারের টেনশন একটু বেশিই নিতে হয়। সরকার নাকি অনেক সুবিধা দেয়, ফ্যামিলি কার্ড দেয়, কিন্তু আমরা তো কিছুই পাই না।”
একই স্থানে কাজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব সেলিনা বেগম। বয়সের ভারে বিশ্রামের সময় হলেও সংসারের দায় তাকে টেনে এনেছে শ্রমবাজারে। চার বছর ধরে অসুস্থ স্বামী কর্মহীন। সন্তানরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত থাকায় স্বামীকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সেলিনা বেগম বলেন, “এই বয়সে কাজ করার কথা ছিল না। কিন্তু স্বামীর অসুস্থতার পর সংসার চালানোর দায়িত্ব আমার ওপরই পড়েছে। সন্তানদেরও সময় নেই আমাদের জন্য। তাই কাজ না করলে সংসার চলে না।”
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “স্বামীর শক্তি যত দিন থাকে, সুখও তত দিন থাকে। পরে কষ্টটাই বেশি সঙ্গী হয়।”
নাসিমা ও সেলিনা বেগমের গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজারো নিম্নআয়ের নারী প্রতিদিন একই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। পরিবারের আর্থিক সংকট, স্বামীর অসুস্থতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমিত সুযোগের মধ্যেই তারা সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
শহরের ব্যস্ততার আড়ালে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম নীরব হলেও তাদের কষ্ট ও প্রত্যাশা প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয়— অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াইয়ে এখনও অনেক নারী একাই বহন করছেন পুরো পরিবারের দায়িত্ব।
