মিরপুরে পানির জন্য হাহাকার

২৪ঘন্টা অনলাইন: রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র পানিসংকট জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রায় দুই মাস ধরে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পীরেরবাগ, মনিপুর, কাফরুল, পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মেট্রোরেল চালুর পর সহজ যাতায়াতের কারণে মিরপুর রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পানিসংকট সেই আকর্ষণে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত পানি না পাওয়ায় দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। অনেককে খাবার পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, আবার গোসল ও গৃহস্থালির অন্যান্য কাজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
পূর্ব কাজীপাড়ার বাসিন্দা সাদিকুর রহমান জানান, গত দুই মাসে একাধিকবার পানি সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। অনেক সময় পানি এলেও তা দুর্গন্ধযুক্ত থাকে। ফলে ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওয়াসার সরবরাহ না থাকায় ট্যাংকারের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
পানিসংকটের প্রতিবাদে ইতোমধ্যে একাধিকবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। শেওড়াপাড়া ও মিরপুর-১০ এলাকায় বালতি ও জগ হাতে সড়কে নেমে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান বাসিন্দারা। তবে এখনও সংকট কাটেনি।
এই পরিস্থিতিতে অনেক ভাড়াটিয়া এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিনের পানির সমস্যার কারণে তিনি মিরপুর ছেড়ে বাড্ডায় নতুন বাসা নিয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরেই সেখানে চলে যাবেন।
একই চিত্র বাড়ির মালিকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কাজীপাড়ার বাড়ির মালিক হেদায়েতুল্লাহ বলেন, তার ভবনের কয়েকজন ভাড়াটিয়া ইতোমধ্যে বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন। শুধু তার ভবন নয়, আশপাশের অনেক ভবনেই এখন ‘টু-লেট’ সাইন দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারের কারিগরি সমস্যার কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে দৈনিক ১২ থেকে ১৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হলেও সাম্প্রতিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ওয়াসার মডস জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী ইয়াদুল হক বলেন, মিরপুরে স্থায়ী সংকট নয়, বরং সাময়িক সরবরাহ সমস্যার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, শোধনাগারের ত্রুটি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা হয়েছে। তবে একই সময়ে অনেক ভবনে মোটর চালিয়ে পানি তোলার কারণে কিছু এলাকায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, এটি কেবল সাময়িক সমস্যা নয়; বরং নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতারই ফল। তার মতে, মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে পানি সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়নি। ফলে সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে মিরপুরের পানিসংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বর্তমানে হাজারো পরিবার প্রতিদিন পানির জন্য সংগ্রাম করছে এবং সমাধানের আশায় দিন গুনছে।
