মাটির ঘামে ফলানো ফসল, বাজারে মিলছে না ন্যায্য দাম

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
২৪ঘন্টা অনলাইন : ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে চলে যান চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের কৃষক নায়োপ আলী। হাতে কাস্তে, কাঁধে ঝুড়ি দিনের পর দিন পরিশ্রম করে ক্ষেত থেকে তোলেন সবুজ, তাজা চিচিঙ্গা। কিন্তু সেই ফসল বাজারে নিয়ে গিয়ে তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা কেজি। এতে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, ক্ষেত থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহনের খরচও উঠছে না।
অধিক লাভের আশায় চলতি মৌসুমে আগাম চিচিঙ্গা চাষ করেছিলেন নায়োপ আলী। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, মাচা তৈরির বাঁশ-তার-দড়ি এবং শ্রমিকের মজুরিসহ বিঘাপ্রতি তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলেও বাজারদরের কারণে সেই বিনিয়োগ এখন লোকসানে পরিণত হয়েছে।
হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, “ক্ষেত থেকে চিচিঙ্গা তুলে বস্তায় ভরে ভ্যানে করে আড়তে নিতে যে খরচ হয়, তিন-চার টাকা কেজি দরে সেটাও ওঠে না। এভাবে চাষ করে সংসার চালানো অসম্ভব।”
স্থানীয় পাইকারি বাজারে বর্তমানে চিচিঙ্গার দাম কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকায় নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মৌসুমের এ সময় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে চাহিদা না থাকায় দাম কমে গেছে।
নায়োপ আলীর মতো একই সংকটে পড়েছেন ইব্রাহিমপুর ও আশপাশের এলাকার আরও অনেক কৃষক। আগাম চাষ করে বেশি দাম পাওয়ার আশায় তাঁরা বিনিয়োগ করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল ভালো আয় হলে সংসারের ব্যয় মেটানো, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো এবং এনজিওর ঋণ পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই আশা ভেঙে পড়েছে।
নায়োপ আলী বলেন, “ঋণ নিয়ে চাষ করি। ন্যায্য দাম না পেলে সেই ঋণ শোধ করব কীভাবে? কৃষকের কথা সবাই বলে, কিন্তু ফসলের দাম না পেলে আমাদের পাশে দাঁড়ায় কে?”
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে মৌসুমের সময় কৃষক প্রায়ই ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। পর্যাপ্ত হিমাগার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সরাসরি বাজারজাতকরণ এবং কার্যকর মূল্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এমন পরিস্থিতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
মাঠে ঘাম ঝরিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করেন কৃষকেরাই। কিন্তু সেই কৃষক যদি উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তবে শুধু তাঁদের জীবিকাই নয়, দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
