বিটলসের রহস্যময় গানের নেপথ্যের কাহিনি

২৪ঘন্টা অনলাইন : ১৯৬৭ সালের ২৫ জুন, জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, জর্জ হ্যারিসন আর রিঙ্গো স্টার লন্ডনের অ্যাবি রোড স্টুডিওজের স্টুডিও ওয়ানে ঢুকে তাঁদের প্রিয় গান 'অল ইউ নিড ইজ লাভ'-এর প্রথম আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন সম্প্রচারে পরিবেশন করেছিলেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে ইউরোনিউজ কালচার এবার মনোযোগ দিচ্ছে ফ্যাব ফোরকে ঘিরে থাকা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এক রহস্যের দিকে এমন এক জিজ্ঞাসা, যা অনেক সংগীতপ্রেমীকেই রাতের ঘুম কেড়ে নেয় তাঁদের ১৯৬৭ সালের ক্লাসিক গান 'আই অ্যাম দ্য ওয়ালরাস'-এ আসলে কে ছিল সেই ওয়ালরাস?
সত্যিটা উদ্ঘাটনের আগে একটু পেছনের গল্প জেনে নেওয়া যাক...
লেননের লেখা এই গানের পেছনে আংশিক অনুপ্রেরণা ছিল লুইস ক্যারলের ১৮৭১ সালের কবিতা "দ্য ওয়ালরাস অ্যান্ড দ্য কার্পেন্টার", সঙ্গে এলএসডি সেবনের দুটি গুঞ্জনরত অভিজ্ঞতাও। পরবর্তীতে যখন লেনন বুঝতে পারেন যে সেই কবিতায় ওয়ালরাসই ছিল খলনায়ক, তখন তিনি বিস্মিত ও মনোক্ষুণ্ণ হন।
কিন্তু সেই মাদকদ্রব্য সেবনের ব্যাপারে তাঁর তেমন কোনো অনুতাপ দেখা যায়নি।
গানটি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁদের টিভি ছবি 'ম্যাজিকাল মিস্ট্রি টুর'-এর সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবামে, এবং এর বিশেষত্ব হলো চতুর্থ স্তবকের শেষ দুই লাইনের জন্য বিবিসি এটি নিষিদ্ধ করেছিল: "ইয়েলো ম্যাটার কাস্টার্ড / ড্রিপিং ফ্রম আ ডেড ডগস আই / ক্র্যাবালকার ফিশওয়াইফ, পর্নোগ্রাফিক প্রিস্টেস / বয়, ইউভ বিন আ নটি গার্ল / ইউ লেট ইওর নিকার্স ডাউন"।
এই ছোট্ট অংশটুকু দেখলেই বোঝা যায়, 'আই অ্যাম দ্য ওয়ালরাস' রঙিন আর পরাবাস্তব চিত্রকল্পে ভরপুর "কর্ন ফ্লেক্সের ওপর বসে থাকা", "দ্য এগম্যান", "এলিমেন্টারি পেংগুইন সিংগিং"-এর মতো উল্লেখ, এমনকি এডগার অ্যালান পো-র প্রতি এক ঝলক রসাত্মক ইঙ্গিতও আছে এতে।
গানটিকে কখনো ভারতীয় দর্শনের উপাদানসমৃদ্ধ বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কখনো অন্ধ ধর্মীয় উপাসনার সমালোচনা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, আর কখনো পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক আক্রমণ বলেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো লেনন গানটি লিখেছিলেন শুধু শ্রোতাদের বিভ্রান্ত করার জন্য।
এক চিঠি পাওয়ার পর তিনি এমনটা করেছিলেন, যেখানে তাঁকে জানানো হয়েছিল, এক শিক্ষক ক্লাসে বিটলসের গান বিশ্লেষণ শুরু করেছেন এবং ব্যান্ডটির গানের কথায় গুরুত্বপূর্ণ ও পণ্ডিতি ব্যাখ্যা আরোপ করছেন। এতে বিরক্ত হয়ে লেনন ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁর গানের কথায় যত বেশি সম্ভব বিমূর্ত চিত্রকল্প ভরে দিয়ে তাঁর শব্দের মধ্যে অর্থ খুঁজতে মরিয়া মানুষদের বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু এখন আসা যাক মূল প্রশ্নে কে ছিল সেই ওয়ালরাস?
এর একটা সূত্র পরে ব্যান্ডের আরেকটি গানে মিলেছিল... তাঁদের ১৯৬৮ সালের ডাবল অ্যালবাম 'দ্য বিটলস' (যা 'হোয়াইট অ্যালবাম' নামেও পরিচিত)-এ আছে গান 'গ্লাস অনিয়ন', যেখানে জন দুষ্টুমির সুরে গেয়েছেন: "দ্য ওয়ালরাস ওয়াজ পল" (ওয়ালরাসটা ছিল পল)।
তাহলে তো উত্তর পাওয়াই গেল। অন্তত ভক্তরা তা-ই ভেবেছিলেন...
কিন্তু ১৯৭০ সালে পরিস্থিতি আবার ঘোলাটে হয়ে যায়, যখন বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর লেনন তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম 'জন লেনন/প্লাস্টিক ওনো ব্যান্ড' প্রকাশ করেন। সেই অ্যালবামের তীক্ষ্ণ-মধুর গান 'গড'-এ গায়ক ঘোষণা করেন: "আই ওয়াজ দ্য ড্রিমউইভার / বাট নাও আইম রিবর্ন / আই ওয়াজ দ্য ওয়ালরাস / বাট নাও আইম জন / অ্যান্ড সো, ডিয়ার ফ্রেন্ডস / ইউল জাস্ট হ্যাভ টু ক্যারি অন / দ্য ড্রিম ইজ ওভার" (আমিই ছিলাম স্বপ্নবোনা মানুষ / কিন্তু এখন আমি নতুন জন্ম নিয়েছি / আমিই ছিলাম ওয়ালরাস / কিন্তু এখন আমি জন / আর তাই, প্রিয় বন্ধুরা / তোমাদেরই এগিয়ে যেতে হবে / স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটেছে)।
তাহলে ওয়ালরাসটা কে ছিল পল, নাকি জন?
এবং এর অর্থ আসলে কী? ওয়ালরাস হওয়াটা কি ভালো কিছু? নাকি একটা অপমান, যদি ভাবি ক্যারলের কবিতায় ওয়ালরাস নিরীহ একদল মানবরূপী ওয়েস্টার (ঝিনুক)-কে প্রতারিত করে তার পিছু নিতে রাজি করিয়ে, তারপর চমকপ্রদভাবে সেই অসহায় দ্বি-কপাটিকা মোলাস্কগুলোকেই গপগপ করে খেয়ে ফেলে?
আসলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টাটাই অর্থহীন, কারণ এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার যেকোনো প্রচেষ্টাই মূলত 'আই অ্যাম দ্য ওয়ালরাস' গানের পরাবাস্তব রসিকতার মূল বিষয়টাই হারিয়ে ফেলে। আগেই বলা হয়েছে এটি একটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অর্থহীন গান, এমন এক বিভ্রান্তিকর রত্ন, যাকে কোনো আক্ষরিক অর্থ দেওয়াই সম্ভব নয়।
এটাকে ভাবা যেতে পারে সেই পরিচিত মিম-এর মতো: "পর্দাটা ছিল নীল রঙের: লেখক যা বোঝাতে চেয়েছিলেন / আর তোমার ইংরেজি শিক্ষক যা ভাবেন লেখক বোঝাতে চেয়েছিলেন।"
শিক্ষক দাবি করেন, "পর্দাটা তার গভীর বিষণ্নতা আর জীবনের প্রতি ইচ্ছাশক্তির অভাবকে প্রতীকায়িত করে।"
লেখক আসলে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন: "পর্দাটা শা***লা নীলই ছিল।"
কখনো কখনো প্রতিটা শব্দের গভীরে অর্থ খোঁজার দরকার নেই। বরং এই উপলব্ধিতেই ডুব দেওয়া ভালো, যে সব কিছুর মধ্যেই খোসার পর খোসা খুলে অর্থ খুঁজে পাওয়ার দরকার নেই। কখনো কখনো এটা স্রেফ একটা কাচের পেঁয়াজ মাত্র।
