দুর্নীতির ফাঁদে সুন্দরবনের রাজস্ব

২৪ঘণ্টা অনলাইন | ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট
অসাধু বন কর্মকর্তা, বনদস্যু ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণে সরকারি রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র।
কাগজে-কলমে মৎস্য, কাঁকড়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা যায়, বনের ভেতরে আগের মতোই সম্পদ আহরণ চলছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে রাতের আঁধারে বনে প্রবেশ করা হচ্ছে। মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহের পর সেগুলো আবার রাতেই লোকালয়ে আনা হচ্ছে। ফলে সম্পদ আহরণ বন্ধ হয়নি, শুধু বন্ধ হয়েছে সরকারি রাজস্ব আদায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনে বনজ ও মৎস্যসম্পদ আহরণে চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি চলছে। বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে পাস ইস্যু প্রক্রিয়ায় কারচুপি করে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাস দেওয়া হলেও তার আড়ালে অনুমোদনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সম্পদ আহরণ করা হয়। এতে যেমন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সরকারের রাজস্বও কমছে।
স্থানীয় জেলে ও বাওয়ালিদের অভিযোগ, বৈধ পাস নিয়েও তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। বনের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা, বনদস্যু ও চাঁদাবাজদের নিয়মিত টাকা দিতে হয়। তাদের দাবি, এসব অবৈধ লেনদেনে আয়ের বড় অংশ হারাচ্ছেন প্রকৃত বনজীবীরা। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
বনদস্যু ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই চক্রের বিরুদ্ধে সাধারণ জেলে-বাওয়ালিদের প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই বললেই চলে।
পাস ব্যবস্থার আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে নির্বিচারে বনজ সম্পদ আহরণ ও মৎস্য শিকার চলছে। এতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদারকির কথা বললেও কার্যকর মনিটরিংয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকায় অবৈধ সম্পদ আহরণ ও পাচার রোধ করা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও স্মার্ট কার্ডভিত্তিক প্রবেশ-প্রস্থান ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি পারমিট প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারা আরও মনে করেন, বনজীবীদের সমবায়ের মাধ্যমে সরাসরি রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং সরকারের আয় বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, দ্রুত দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে রাজস্ব ক্ষতি জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাই প্রশাসনিক সংস্কার, কঠোর তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিই হতে পারে সুন্দরবনের সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব রক্ষার কার্যকর উপায়।
