আটলান্টিকের নীল হাঙর: কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ জয়ের গল্প
নামেই যাদের চমক, ফিফা ২০২৬ পর্ব ২

২৪ঘন্টা অনলাইন : ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত সুযোগ পেয়েছে নতুন ৪ টি দল। জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ভৈগোলিক অবস্থান,রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ইত্যাকার বিষয়গুলো বিবেচনায় বিশ্বে আরো উন্নত দেশ থাকা সত্ত্বেও এই দেশগুলো বিশ্বকাপ ২০২৬এ নিজের অবস্থান তৈরি করে নেওয়ায় নতুন দেশ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
২৪ঘন্টা অনলাইন এর ডেস্ক প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে এই চারটি দেশের ফুটবল এবং এর সাথে সম্পৃক্ত খুটিনাটি বিষয়গুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছে।
চার পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হবে “কেপ ভার্দ” নিয়ে।
স্বপ্নের সাত দশক, সাতবারের চেষ্টা, একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে মাত্র ৫৭০ কিলোমিটার দূরে ছড়িয়ে আছে দশটি ছোট্ট দ্বীপ। এই দ্বীপপুঞ্জের নাম কেপ ভার্দে। জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে এই ছোট্ট দেশটি এমন এক স্বপ্ন পূরণ করল, যার জন্য অপেক্ষা ছিল দশকের পর দশক। ইসোয়াতিনির বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয়ে কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। সেই মুহূর্তে রাজধানী প্রাইয়ার রাস্তায় নেমে আসে লাখো মানুষ।
শুরুর গল্প: ১৯৭৮ থেকে ২০২৬
১৯৭৮ সালের ১৯ এপ্রিল গিনির বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে কেপ ভার্দে, ০-১ গোলে হেরে। সেই থেকে শুরু এক দীর্ঘ যাত্রার।
কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৮২ সালে। ১৯৮৬ সালে দেশটি ফিফার সদস্যপদ পায়। এরপর থেকেই শুরু হয় বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখা।
২০০২ সালের বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে টানা সাতটি বাছাইপর্বে অংশ নেয় 'ব্লু শার্কস'। প্রতিবারই স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে। কিন্তু হাল ছাড়েনি এই দ্বীপের ছেলেরা।
বাছাইপর্বের লড়াই: দক্ষতার সঙ্গে দৃঢ়তা
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কেপ ভার্দে পড়েছিল সিএএফ গ্রুপ ডি-তে ক্যামেরুন, অ্যাঙ্গোলা, লিবিয়া, ইসোয়াতিনি ও মরিশাসের সঙ্গে।
১০ ম্যাচে মোট ১৬ গোল করে গ্রুপ শীর্ষে থেকে সরাসরি কোয়ালিফাই করে কেপ ভার্দে। যোগ্যতা অর্জনকারী আফ্রিকান দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম গোল করেও তারা শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে কারণ দলটি প্রতিটি গোলকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়েছে।
ঘরের মাঠে পাঁচটি ম্যাচে পাঁচটিতেই জিতেছে তারা, একটি গোলও হজম না করে। এই রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলাই ছিল তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
গ্রুপ রানার্সআপ ছিল ক্যামেরুন আফ্রিকার সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিশ্বকাপ দলগুলোর একটি। সেই ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই বলে দেয়, এই অর্জন কতটা অসাধারণ।
কোচ বুবিস্তা: খেলোয়াড় থেকে ইতিহাসের নির্মাতা
পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, সবার কাছে 'বুবিস্তা' নামে পরিচিত। একসময় কেপ ভার্দের জাতীয় দলের অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার ছিলেন তিনি। অ্যাঙ্গোলা, স্পেন ও পর্তুগালে ক্লাব ফুটবল খেলেছেন। ২০২০ সালে কোচের দায়িত্ব নিয়ে লক্ষ্য ঠিক করেন দেশকে বিশ্বকাপে নিয়ে যেতে হবে।
বুবিস্তার কৌশল ছিল দলকে 'হারানো কঠিন' বানানো শক্তিশালী রক্ষণব্যূহ, শৃঙ্খলা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখেছে।
প্রবাসীদের দল: ১৪ দেশের খেলোয়াড়
কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিশাল প্রবাসী সমাজ। দেশের বাইরে যারা থাকেন, তাদের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
বিশ্বকাপ দলের ১১ জন মূল একাদশ সদস্যের সবাই বিদেশে খেলেন ১৪টি ভিন্ন দেশের ক্লাবে।
মূল খেলোয়াড়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য
রবের্তো 'পিকো' লোপেস: আয়ারল্যান্ডে জন্ম, আইরিশ মায়ের সন্তান। শামরক রোভার্সের এই ডিফেন্ডারকে লিংকডইনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে কেপ ভার্দে দলে নেওয়া হয়েছিল প্রথমে তিনি সেই বার্তা উপেক্ষা করেছিলেন।
দাইলন লিভ্রামেন্তো: মাত্র ২৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বাছাইপর্বে চার গোল করে দলের শীর্ষ গোলদাতা।
রায়ান মেন্দেস ও জোভানে কাব্রাল দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বিপজ্জনক আক্রমণভাগের খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপ মঞ্চে: স্পেনকে আটকে দেওয়ার রূপকথা
২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ ছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব।
প্রথম ম্যাচেই ইতিহাস স্পেনের বিরুদ্ধে ০-০ গোলশূন্য ড্র। বিশ্বকাপে এটি কেপ ভার্দের প্রথম পয়েন্ট।
সারা ম্যাচে স্পেন বল দখলে এগিয়ে থেকেও গোল করতে পারেনি। গোলরক্ষক ভোজিনহার অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং কেপ ভার্দের সুশৃঙ্খল রক্ষণ স্পেনকে থামিয়ে দেয়।
সেদিন আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপের মানুষেরা টিভির পর্দায় যা দেখেছে, তা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।
ছোট্ট দেশের বড় বার্তা
কেপ ভার্দে ইতিহাসে জনসংখ্যার বিচারে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে।
মাত্র ৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম, সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশ কিন্তু স্বপ্নের কোনো সীমা নেই। কেপ ভার্দের 'ব্লু শার্কস' পৃথিবীকে মনে করিয়ে দিয়েছে ফুটবলে দেশের আকার নয়, হৃদয়ের আকারই শেষ কথা।
