সিডর-আক্রান্ত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শাকিরা

২৪ঘণ্টা অনলাইন: ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শাকিরার নাম নতুন করে আলোচনায় আসা। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ কিংবা ‘লা লা লা’ গানের মাধ্যমে বিশ্বকাপের সঙ্গে এক অনন্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন ল্যাটিন পপ তারকা। তবে অনেকেরই অজানা, বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করা এই কলম্বিয়ান শিল্পী একসময় নীরবে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। আর সেই সফরে সিডর-দুর্গত মানুষের দুর্দশা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
২০০৭ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়েছিল বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। সেই সময় জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন শাকিরা। তার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শিশুদের বাস্তব পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখা।
ঢাকায় পৌঁছানোর পর রাজধানীতে দীর্ঘ সময় না কাটিয়ে তিনি ছুটে যান দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গত এলাকায়। পটুয়াখালীর সিডর-আক্রান্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শিশুদের সাহস, স্বপ্ন এবং জীবনসংগ্রাম তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল ১১ বছর বয়সী নিপা নামের এক শিশুর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সিডরে মা-বাবাকে হারানো মেয়েটি শাকিরাকে একটি শোকগাথা শুনিয়েছিল। পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শাকিরা বলেন, গানটির অর্থ ছিল—‘মা, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে একটি চিঠি লিখো।’ সেই মুহূর্ত তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
দুর্যোগের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে শাকিরা বলেছিলেন, পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যেসব মা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, তাদের মুখ আজও তার স্মৃতিতে অমলিন। এসব দৃশ্য তাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল।
তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শিশুদের হাসি, খেলাধুলা এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন তাকে আশাবাদী করেছিল। তিনি বলেছিলেন, এত কষ্টের মধ্যেও শিশুদের ডাক্তার, নার্স কিংবা অন্য কিছু হওয়ার স্বপ্ন শুনে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি রাজশাহীতেও ইউনিসেফের একটি শিশু উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন। শিশুদের শিক্ষা ও কল্যাণে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে শাকিরার। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ‘পিয়েস দেসকালসোস’ (খালি পা) নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করে।
শাকিরার মতে, শৈশবে নিজের পরিবারের আর্থিক সংকট এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবন কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাই তাকে মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছে। সে কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের দুর্দশা তার হৃদয়কে স্পর্শ করে।
সফর শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। তার ভাষায়, সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই দুর্যোগপীড়িত শিশুদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
আজ বিশ্বকাপের আবহে যখন শাকিরার গান, পারফরম্যান্স ও গ্ল্যামার নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন অনেকেরই অজানা রয়ে গেছে তার মানবিক এই অধ্যায়ের কথা—যেখানে তিনি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শিশুদের গল্প শুনেছিলেন, তাদের কষ্টে কেঁদেছিলেন এবং তাদের স্বপ্নকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।
