ছয় শিশুর বিচার, ছয়শর দায় কার?

২৪ঘণ্টা অনলাইন: বাংলাদেশের সংবিধান বলছে, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান। কিন্তু বাস্তবে কি সবাই সমান বিচার পান? সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত তদন্ত হয়েছে, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জবাবদিহিতা নিয়ে যে প্রশ্ন ছিল, এই সিদ্ধান্ত সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
একইভাবে পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা মামলায় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে রায় ঘোষণাও বিচার ব্যবস্থার ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে। দ্রুত বিচার অপরাধ দমনে কার্যকর বার্তা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সব ক্ষেত্রে কি একই ধরনের সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে?
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শত শত শিশুর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ব্যর্থতা ছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফও সময়মতো টিকা সংকটের বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছিল বলে জানিয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক অবহেলার উদাহরণ।
এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও এখন পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ হয়নি। দায় নির্ধারণ হয়নি, কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় একই ধরনের জবাবদিহিতা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো সমতা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হতে হবে। কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার আর অন্য ক্ষেত্রে নীরবতা—এই বৈপরীত্য ন্যায়বিচারের ধারণাকে দুর্বল করে।
বর্তমান সরকার হামের বিস্তার রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অতীতের ব্যর্থতা বা অবহেলা থাকলে সেটিরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা ছাড়া ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় প্রতিরোধ করা কঠিন।
বাংলাদেশে আইনের শাসন আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রতিটি মৃত্যুর মূল্য সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে। ছয় শিশুর জন্য যেমন বিচার প্রয়োজন, তেমনি শত শত শিশুর মৃত্যুর কারণও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। ন্যায়বিচারের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।
