দেশীয় পণ্যে ভরপুর লালদীঘি মেলা

২৪ঘণ্টা অনলাইন: চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শহর যেন বছর ঘুরে আবার নিজের আসল রূপে ফিরেছে। লালদিঘি মাঠ ঘিরে মানুষের ঢল, মেলার রঙিন পসরা আর মাইকভরা ডাক মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য উৎসবের আবহ। শতবর্ষী জব্বার বলীখেলা ঘিরে বসা বৈশাখী এই মেলা শুধু একটি আয়োজন নয়– এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের মিলনমেলার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
২৪ এপ্রিল শুরু হওয়া এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং চট্টগ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচায়ক। আর ঐতিহ্যবাহী বলি খেলার আসর বসবে ২৫ এপ্রিল বিকেল ৩টায়। এবার বলি খেলা হবে লালদিঘী মাঠে বালু দিয়ে বানানো মঞ্চে। ১১৭তম বলীখেলার মেলায় রঙিন খেলনা, মাটির হাঁড়ি, বাঁশের তৈরি সামগ্রী, বৈশাখী সাজসজ্জা, ছোট বড় শত শত দোকানে সাজানো পসরা যেন এক টুকরো গ্রামীণ বাংলাকে শহরের বুকে এনে বসিয়েছে।
এদিন বিকেলে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে মাটির তৈজসপত্র, খেলনা আর বাঁশ-বেত, মুড়ি-মুড়কি, গাছের চারা, ফুলঝাড়ু, হাতপাখাসহ নানা ধরনের গৃহস্থালি ও লোকজ বিভিন্ন পণ্য সাজিয়ে কেনাবেচা শুরু করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মেলায় সবচেয়ে বেশি এসেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্র। মাটির তৈরি ঘর সাজানোর বিভিন্ন ধরনের আসবাব, শৌখিন জিনিসপত্র, শিশুদের খেলনার পুতুল নিয়ে বসেছেন দোকানিরা। কাঠের তৈরি খাট, আলমিরা, আলনাসহ আরও নানা আসবাবপত্র নিয়েও বসেছেন কয়েকজন দোকানি।
মেলার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায়, কেউ দরদাম করছেন, কেউ পরিবারের ছোট সদস্যদের হাত ধরে ঘুরছেন, আবার কেউ থেমে থেমে উপভোগ করছেন এই উৎসবের আবহ। শিশুদের হাসি, বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর দর্শনার্থীদের কোলাহল মিলিয়ে এক আলাদা ছন্দ তৈরি হয়েছে পুরো এলাকায়।
এই ভিড়ের মাঝেই কথা হয় মাটির পণ্য বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই মেলাটার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করি। শহরের মানুষ এখন আবার মাটির জিনিস কিনছে। আগের চেয়ে বিক্রি অনেক ভালো।’ বাঁশ ও কাঠের তৈরি গৃহস্থালি পণ্যের বিক্রেতারা জানান, ‘প্লাস্টিকের জিনিসের ভিড়ে আমাদের পণ্য হারিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন মানুষ টেকসই জিনিস চাচ্ছে। মেলায় এসে ভালো সাড়া পাচ্ছি।’ ক্রেতাদের মধ্যেও দেখা গেছে সমান আগ্রহ। নগরীর বাসিন্দা বলেন, ‘মাটির হাঁড়ি আর কাঠের খুন্তি কিনলাম। এগুলো ব্যবহারেও ভালো, আবার একটা আলাদা ঐতিহ্যের অনুভূতি আছে।’
আরেক ক্রেতা নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকার বাসিন্দা বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি, যাতে তারা আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখতে পারে, তাই কিছু দেশি জিনিসও কিনলাম।’ মেলায় আসা ফটিকছড়ির বাসিন্দা বলেন, ‘জব্বারের বলীখেলা আর এই বৈশাখী মেলা আমাদের চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের বড় অংশ। এখানে এলে মনে হয় পুরোনো সংস্কৃতি এখনো জীবন্ত আছে– খেলা আর মেলার এই মিলনটাই সবচেয়ে উপভোগ করি।’
এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই ঐতিহ্যবাহী জব্বার বলীখেলা। ২৫ এপ্রিল বিকেলে বসবে মূল লড়াইয়ের আসর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বলীরা শক্তি আর কৌশলের লড়াইয়ে নামবেন, যা দেখতে প্রতিবছর হাজারো মানুষ ভিড় করেন লালদিঘি মাঠে। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা থেকে ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এর সূচনা করেছিলেন। সময়ের স্রোত পেরিয়ে আজ তা শুধু একটি খেলাই নয়, বরং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মেলা ও বলী খেলাকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রয়েছে মেডিকেল টিম ও ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি, যাতে দর্শনার্থীরা নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারেন এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। এবারের মেলার সময়সূচিতে আছে একটু পরিবর্তন। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা মাথায় রেখে ২৬ এপ্রিল ভোরের মধ্যেই মেলা শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আবদুল জব্বার সওদাগরের নাতি শওকত আনোয়ার বাদল জানান, এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ১০৮ জন বলী অংশ নেবেন। বলী খেলার উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। খেলা শেষে বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ করবেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
