জেলেদের অভিযোগ, মেলেনি সরকারি সহায়তা

২৪ঘণ্টা অনলাইন: সমুদ্রে ৫৮ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে। দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকারের এই উদ্যোগ প্রতিবছরের মতো এবারও কার্যকর করা হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে উপকূলীয় জেলে পরিবারগুলোর জীবনে। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন ঘাটে নোঙর করে আছে শত শত ট্রলার, থমকে গেছে মাছ ধরার ব্যস্ততা, স্থবির হয়ে পড়েছে মৎস্যনির্ভর অর্থনীতি। এর মধ্যে সরকারি খাদ্যসহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ জেলের অভিযোগ, এখনো তাদের হাতে পৌঁছেনি সেই সহায়তা। ফলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পড়ায় চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
সরেজমিনে নগরের বিভিন্ন ঘাট পরিদর্শনে দেখা যায়, ফিশারিঘাট, রানী রাশমনি ঘাট, উত্তর কাট্টোলি ঘাটসহ জেলার উপকূলবর্তী ঘাটগুলোতে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রাখা হয়েছে শত শত সমুদ্রগামী ট্রলার। গত ১৫ এপ্রিল থেকে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর ঘাটে ফিরতে শুরু করে এসব ট্রলার। জেলেদের কেউ নতুন জাল বুনছেন, কেউ চায়ের আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন, আবার কেউ নিজেদের ট্রলার ও ফিশিং বোট পুনরায় চলাচল উপযোগী করে নিচ্ছেন।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে সবচেয় বিপাকে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার জেলে পরিবার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রাম মহানগরসহ ছয়টি উপজেলার মোট ৪৬ হাজার ৯৭ জন সমুদ্রগামী জেলেকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে ৫৮ দিনের জন্য খাদ্যসহায়তার চাল দেওয়ার কথা।
তবে অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ জেলে পরিবারে এখনো পৌঁছায়নি এই সরকারি সহায়তা। মো. বাবুল নামে এক জেলে বলেন, ‘আমরা সাগরে অনেক কষ্ট করে মাছ ধরি। এখন সরকার সাগরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আমরা শুধু সাগরে জাল ফেলা আর টানা শিখেছি, অন্য কোনো কাজ জানি না। সরকারি চালও পাচ্ছি না। এখন বাড়িতে বসে থাকা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। আমরা চলব কী দিয়ে?’
রতন বাবু নামে নগরের ফিশারিঘাটের আরেক জেলে জানান, সরকারি খাদ্যসহায়তা কেউ পাচ্ছে, আবার কেউ পাচ্ছে না। পরিবারে আটজন সদস্য। আমার কার্ড থাকলেও এখনো চাল পাইনি। বলা হয়েছে, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
তবে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করে দ্রুত সময়ের মধ্যে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম। তিনি বলেন, ‘সাগরে যারা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না, তাদের জন্য সরকারের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী সপ্তাহের মধ্যে তালিকাভুক্ত জেলেরা নির্ধারিত চাল পেয়ে যাবেন। নিবন্ধিত জেলেরা যেন সঠিকভাবে চাল পান, সে জন্য মাঠপর্যায়ে বিতরণ কার্যক্রম মনিটর করা হচ্ছে।’
এদিকে চালের গুণগতমান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক জেলে। পাশাপাশি ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
সরকারিভাবে নিবন্ধিত হতে বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন শংকর কুমার দাস। তিনি বলেন, ‘সরকার অনুদান দেয়, কিন্তু আমরা পাই না। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা যাদের পছন্দ করেন, শুধু তাদেরই অনুদান দেন। আমার পরিবারে বারো জন সদস্য। আমরা সমুদ্রে যাই তিনজন, কিন্তু শুধু আমাকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। তাও কার্ড পেতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা সিগনেচার আর কাগজপত্রের জন্য হাজার হাজার টাকা নেন।’
তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগমের দাবি, নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে জেলেদের কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, ‘মৎস্যজীবীদের হালনাগাদ কার্যক্রম সারা বছরই চলে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, জেলেদের নিবন্ধনের জন্য মৎস্য অফিসে আবেদন করতে হয়। তারা কোন নৌকায় সাগরে যান, তার প্রত্যয়নপত্র স্থানীয় চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের কাছ থেকে নিতে হয়। এরপর নির্ধারিত ফরমে আবেদন করলে তা মহাপরিচালকের দপ্তরে পাঠানো হয় এবং যাচাই-বাছাই শেষে তালিকাভুক্ত করা হয়। অনেক সময় জেলেরা সঠিক তথ্য বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়, ফলে ভোগান্তি বাড়ে।’
তিনি আরও জানান, চট্টগ্রামে যেসব জেলে এখনো নিবন্ধনের বাইরে আছেন, পর্যায়ক্রমে তাদের সবাইকে সহায়তার আওতায় আনা হবে। এ লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
